‘আমার যা কিছু ছিল সব দিয়েছি। আর কিছুই দেওয়ার নেই।’
কথাটা লিওনেল মেসির। বলেছিলেন গত ৩১ আগস্ট আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার ঘোষণায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেসির সেই ঘোষণার পর আবেগে ভেসেছিলেন সবাই। মুহূর্তের মহিমায় তখন আর কারও মনে হয়নি মেসির এই কথাটা আসলে শুভঙ্করের ফাঁকি!
মনে হবে কেন? ফুটবলে একটা লোকের বয়স ৩৯ বছর। যা যা জেতা সম্ভব, সবই জেতা শেষে দেখলেন আকাশি–সাদার বাগানে ফুটেছে দারুণ কিছু কুঁড়ি। শিকড় নরম করে সরে দাঁড়ানোর সময়টা যে তখনই, সেটা তো ওই বাগানের সবচেয়ে বয়স্ক ও ভরন্ত ফল গাছটির এমনিতেই বোঝার কথা। মেসি সেভাবেই অবসরের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়ার পর সবাই তাঁকে হারানোর আবেগে আর ভাবার সময় পাননি, আসলেই কি তাঁর আর দেওয়ার কিছু নেই?
মেসিও ঠিক এ সুযোগই নিয়েছেন। জানতেন, ওই ঘোষণাটা শোনার তোড়ে সম্পূরক সৌজন্যতা হিসেবে ‘আর দেওয়ার কিছু নেই’—কথাটা যাচাইয়ের সময় পাবে না কেউ। তাতে আর্জেন্টিনাকে তাঁর ‘ফাঁকি’ দেওয়াটাও কেউ ধরতে পারবে না।
হ্যাঁ, ফাঁকিই। অবসর ঘোষণার পর ক্লাব ফুটবলে তাঁর পারফরম্যান্স দেখে আর্জেন্টিনার একটু আবেগপ্রবণ সমর্থক এমন কিছু ভেবে বসলে কি তাঁকে দোষ দেওয়া যায়?
আগস্টের শেষ দিনে সেই অবসর ঘোষণার পর মেসি কী করেছেন দেখুন—ইন্টার মায়ামির হয়ে ক্লাব ফুটবলে ১২ ম্যাচে ৯ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট। এর সঙ্গে ৭ অক্টোবর বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর শেষ ম্যাচটি যোগ করলে হিসাবটা দাঁড়ায় ১২ ম্যাচে ৯ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট।
বলুন তো, মেসির কি আর্জেন্টিনার জার্সিতে সত্যিই আর দেওয়ার কিছু ছিল না?
জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার পরও মেসির ধার কমেনি। ক্লাব ফুটবলে দারুণ খেলে যাচ্ছেনঅবসর ঘোষণার আগে ক্লাব ফুটবলে তাঁর সর্বশেষ ১২ ম্যাচে ১১ গোল ও ৯ অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ অবসর নেওয়ার আগে এবং পরে পারফরম্যান্সের খুব বেশি হেরফের নেই। অবসর ঘোষণার আগে খেলা বিশ্বকাপে তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্স এই তালিকায় বিবেচনায় না নেওয়ার কারণটা একটু অন্য রকম। আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি যে সব সময় নিংড়ে দেন, ভালো খেলবেন যে বেশির ভাগ সময়ই—সেটা এত দিনে সবারই জানা ছিল। সাধারণত জাতীয় দলে খেলোয়াড়েরা কত দিন খেলা চালিয়ে যাবেন, সেই সিদ্ধান্তটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা নেন ক্লাব ফুটবলের ফর্ম ও ফিটনেস দেখে।
তো বিশ্বকাপে ৮ ম্যাচে ৮ গোল করা মেসি আর্জেন্টিনাকে তুলেছিলেন ফাইনালে। সেখানে হারতে হয় স্পেনের বিপক্ষে এবং নিজেও ততটা ভালো খেলেননি। এর পাশাপাশি বাবার মৃত্যুর শোক—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সি তুলে রাখার সিদ্ধান্তটি নেওয়ার আগে মেসি নিশ্চয়ই তাঁর ফর্ম ও ফিটনেস নিয়েও ভেবেছেন। সেখানে তিনি নিজেকে এক শতে এক শ না দিলেও পরিসংখ্যান তো মিথ্যা বলতে পারে না!
মেসি না রোনালদো: বয়স ৩০ পেরোনোর পর কে বেশি ভালোপারে শুধু মেসির পা জোড়া। মিথ্যে অজুহাত দিতে! কারণটা কি খেলাধুলার সেই চিরায়ত কথা? ভারতীয় ক্রিকেটে চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের কিংবদন্তি বিজয় মার্চেন্ট ব্যাপারটা দারুণভাবে বলে গেছেন, ‘কবে অবসর নেবে, প্রশ্নটা আসার আগেই সরে যাও, যাতে লোকে বলে, কেন অবসর নিচ্ছ।’
পায়ে ধার থাকতে থাকতেই মেসি ভেবেছেন, সরে দাঁড়ানোই ভালো। তারপর সেই পায়ের ধারে ক্লাব ফুটবলে একের পর এক প্রতিপক্ষ যখন কচুকাটা হচ্ছে, তখন বাকি বিশ্ব মেসিকে নিয়ে বিজয় মার্চেন্টের কথার শেষের অংশটা ভাবছে—‘কেন অবসর নিয়েছ?’ আর্জেন্টিনার একটু দুষ্টু সমর্থক তাই ভাবতে পারেন, নিজেকে নিংড়ে দেওয়ার পরও বাকি থাকা অংশটুকু নিয়ে মেসি আসলে আর্জেন্টিনার সঙ্গে মজা নিচ্ছেন!
কীভাবে?
গত সেপ্টেম্বরে আর্জেন্টিনার জার্সি খুলে রাখেন মেসিরাশিয়ান মহামতি লেখক লিও তলস্তয়ের একটি গল্প আছে ‘হোয়াট মেন লিভ বাই’ বা ‘মানুষ কী নিয়ে বাঁচে’। সেই গল্পে তলস্তয় বুঝিয়েছেন, মানুষ কেবল নিজের স্বার্থ বা বেঁচে থাকার তাগিদে বাঁচে না, মানুষ বাঁচে ভালোবাসা ও প্রেমের ওপর ভিত্তি করে। আচ্ছা, বলুন তো, এই যে ৩৯ বছর বয়সী মেসিকে নিয়েও বলতে হচ্ছে ‘কেন এখনই অবসর নিলেন’—এ কথাটা যদি আপনার ক্ষেত্রে হতো, শুনতে কেমন লাগত!
অবশ্যই মধুর। ভালোবাসায় মাখা বিরহ দহন। পৃথিবীর সব মানুষই এই অনির্বচনীয় অনুভূতিটা পেতে চায়। মেসিও তো মানুষ, নাকি! অবশ্য গত দুই দশকে কোনো ফুটবলারকে নিয়ে এই সন্দেহ যদি সবচেয়ে বেশি জেগে থাকে, সেটাও কিন্তু মেসিই।
সন্দেহ জাগছে এখনো। ‘আর কিছুই দেওয়ার নেই’ বলে অবসর নেওয়ার পর একটা লোক এই বয়সে ওভাবে খেলেন কীভাবে! গত ১৮ অক্টোবর আটলান্টার বিপক্ষে মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে দৌড়ে বক্সে ঢুকে করা গোলটি? আটলান্টার ডিফেন্ডার জুনিয়র আলোনসো বয়সে তাঁর চেয়ে ছয় বছরের ছোট হয়েও না পেরেছেন দৌড়ে কিংবা ড্রিবলিং ঠেকাতে! আবার সেই ম্যাচেই বক্সের ভেতর দৌড়ের ওপর তিনজনকে কাটিয়ে করা গোলটি? তিন ডিফেন্ডারের সবাই শুধু বয়সে মেসির ছোট নয়, শারীরিক সামর্থ্যেও এগিয়ে। কিন্তু মাঠে এর সব মিথ্যা হয়ে দেখা গেল ভিন্ন কিছু।
মেসির দুর্দান্ত গোলে জয় ইন্টার মায়ামির, হেডে অ্যাসিস্টও করলেনএমন কিছু, যেটা দেখা গেল আজ সকালেও। বক্সে দৌড়ের ওপর হেডে বল পেছনে পাঠিয়ে বানানো গোলের উৎসটি; যা দেখে মনে পড়তে পারে তরুণ মেসিকে, যাঁর শরীরে চারপাশেই একটা করে ‘চোখ’ আছে বলে বিশ্বাস করা হতো। নইলে কোন খেলোয়াড় কোথায় আছেন টের পান কীভাবে!
কিংবদন্তিরা টের পান। সেটা শুধু গোলের সুযোগ খোঁজায় নয়, মানুষের মনের ভাবগতিকও। শচীন টেন্ডুলকারের মতো মেসিকেও অবসর নেওয়ার আগে জাতির তুমুল প্রত্যাশার চাপ নিয়ে খেলতে হয়েছে। সময় বুঝে সেই চাপটা সরিয়ে রাখার পর মেসি নিশ্চয়ই এখন আরও বেশি ফুরফুরে মেজাজে। পুরোনো সেই আগুনের ফুলকি তাই ঠিকরে বেরোচ্ছে!
| IN CASE YOU MISSED IT: Here are the full highlights of 39-year-old Lionel Messi’s masterclass against New England. https://t.co/PIS8bO1hH2
— Winna F.C. (@WinnaFC) November 2, 2026
খেলাটা এখনো উপভোগ করেন বলেই এর উত্তর আসলে মেসিও জানেন না। কেউ কেউ ভাবতে পারেন, হাজার গোলের মাইলফলকে পৌঁছাতেই বুঝি মেসি এখনো খেলে যাচ্ছেন! হতে পারে, আবার না–ও পারে। তবে কারণ যেটাই হোক, তাতে কিন্তু একটু অভিমানী আর্জেন্টিনা সমর্থকের কাঠগড়া থেকে মেসির মুক্তি মিলছে না!
প্রশ্ন উঠতে পারে, মেসি হাজার গোলের মাইলফলকে পৌঁছাতে চান ভালো কথা—তা, আর্জেন্টিনার জার্সিতে খেলে গেলে তো সেটা আরও দ্রুতই হতো! তাহলে কেন এই ‘অকাল’ অবসর?
হ্যাঁ, পৃথিবীর এই আক্ষেপই তো শুনতে চেয়েছেন মেসি। ওটাই তাঁর খেলার সার্থকতা—যে অনুভূতিটুকু থাকে শুধু নিজের ভেতরে! তাই মিথ্যে অজুহাত দিয়ে মেসির পা জোড়া এখন মিথ্যে বলছে মনে হলেও আর্জেন্টিনার জন্য এর চেয়ে বড় সত্যি আর হয় না।