সকালের আকাশ তখন ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হচ্ছে। বৃষ্টিভেজা প্রকৃতির ওপর রোদ ছড়িয়ে পড়তেই যেন জেগে উঠেছে এক হলুদ উৎসব। গাঢ় সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে উজ্জ্বল হলুদ ফুল। কোথাও থোকা থোকা ফুল, কোথাও ডালজুড়ে সোনালি আবরণ। দূর থেকে মনে হয়, সবুজের বুকজুড়ে কেউ ছড়িয়ে দিয়েছে সোনার প্রলেপ।
মৌলভীবাজার শহরের সৈয়দ মুজতবা আলী সড়কে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠের উত্তর পাশ এখন এমনই হলুদ-সোনালি রূপে সেজেছে। মাঠের পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত সারিবদ্ধ গাছগুলোয় ফুটেছে অসংখ্য চন্দ্রপ্রভা ফুল। শহরের ইট-পাথরের ভিড়ে এই সবুজ আর হলুদ তৈরি করেছে অন্য রকম এক মায়াবী দৃশ্য।
সড়কের পাশে হলুদ ফুলের সৌন্দর্য। বৃহস্পতিবার সকালে মৌলভীবাজার শহরের সৈয়দ মুজতবা আলী সড়কেবৃহস্পতিবার সকালে সড়কটি দিয়ে যেতে যেতে দেখা গেল সেই ফুলের রাজ্য। গাছের ডালপালা ছাপিয়ে ফুটে আছে উজ্জ্বল হলুদ ফুল। কোথাও বিশাল থোকা—কারও এলানো খোঁপার মতো। কোথাও ফুলের ভারে ডাল নুয়ে পড়েছে। বৃষ্টির পর ফুলগুলো যেন আরও কোমল, আরও সতেজ। ফুলের রাজ্যে ব্যস্ত ভ্রমর আর মৌমাছিরাও। এক ফুল থেকে আরেক ফুলে তাদের ছোটাছুটি। গুনগুন শব্দে মুখর চারপাশ। যেন ফুলের কানে কানে অবিরাম কথা বলে চলেছে তারা।
উজ্জ্বল হলুদ ফুলে ভ্রমর। বৃহস্পতিবার সকালে মৌলভীবাজার শহরের সৈয়দ মুজতবা আলী সড়কেসৈয়দ মুজতবা আলী সড়ক মৌলভীবাজার শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর একটি। শহরের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মানুষের চলাচলের পথ এটি। পাশেই ওই উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠ। শহরের ব্যস্ততার মধ্যে মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়ানোর অন্যতম জায়গা এই মাঠ। মাঠের পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিমে এম সাইফুর রহমান মিলনায়তন পর্যন্ত রয়েছে এমন অনেক গাছ। প্রায় প্রতিটি গাছেই এখন ফুলের উচ্ছ্বাস।
সকালের রোদ একটু একটু করে বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্রপ্রভার রংও যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল, ঝলমল করছিল। হাওয়ায় দুলছিল ডালপালা। রাতের বৃষ্টিতে অবশ্য কিছু ফুল ঝরে পড়েছে। কোনোটি সীমানাপ্রাচীরের ওপর আটকে আছে, কোনোটি সড়কে। আবার কোনোটি সবুজ ঘাসের ওপর বিছিয়ে রয়েছে। সকালে কয়েকজন নারীকে হাতের নাগালে থাকা ফুল ছিঁড়ে ব্যাগে রাখতে দেখা গেল। কেউ কেউ বাঁশের আঁকশি দিয়ে ডাল টেনে ফুল তুলছিলেন। এতে কয়েকটি ডালও ভেঙে গেছে।
সকালবেলা ফুল তুলছেন এক নারী। বৃহস্পতিবার সকালে মৌলভীবাজার শহরের সৈয়দ মুজতবা আলী সড়কেবছর কয়েক আগে মৌলভীবাজারের বাসিন্দা কানাডাপ্রবাসী প্রয়াত নুরুর রহমানের উদ্যোগে এসব গাছ রোপণ করা হয়েছিল। গাছগুলো টিকিয়ে রাখতে তিনি নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বাঁশের ঝুপড়ি দিয়ে গাছ রক্ষা এবং পানির ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। এ কাজে তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শহরের সাংস্কৃতিক সংগঠক ও চিকিৎসক এম এ আহাদ এবং অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, লেখক ও ছোটকাগজ ফসল–এর সম্পাদক মো. আবদুল খালিক। মৌলভীবাজার পৌরসভা ও সরকারি উচ্চবিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও গাছগুলো রক্ষায় সহযোগিতা করেছে।
গাছের নিচে ঘাসে ঝরে পড়া ফুল। বৃহস্পতিবার সকালে মৌলভীবাজার শহরের সৈয়দ মুজতবা আলী সড়কেচন্দ্রপ্রভা ঝোপালো ধরনের উদ্ভিদ। উজ্জ্বল হলুদ রঙের ঘণ্টা আকৃতির ফুলের জন্য এটি সহজেই নজর কাড়ে। এ নাম ছাড়াও ফুলটি সোনাপাতি, স্বর্ণপাতি, গৌরিচৌরি কিংবা ঘণ্টি ফুল নামে পরিচিত। আমেরিকায় আদি নিবাস হলেও সৌন্দর্যের কারণে বাংলাদেশেও এখন এই গাছ বেশ পরিচিত। এটি চিরসবুজ বা আধা চিরসবুজ। সাধারণত ১০ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। ডালের আগায় বড় বড় থোকায় ফুল ফোটে। উজ্জ্বল হলুদ ফুল ভ্রমর, মৌমাছি ও প্রজাপতিকে আকৃষ্ট করে।
সকাল গড়িয়ে যাচ্ছিল। শরতের আকাশে সাদা সাদা মেঘ জড়ো হয়ে আবার ভেসে যাচ্ছিল। ভাঙা মেঘের ফাঁকে নীল আকাশ আরও চকচকে হয়ে উঠছিল। আর সেই আকাশের নিচে হাওয়ায় দুলছিল চন্দ্রপ্রভার সোনালি ঢেউ।